৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস। এই দিবসে আমরা যেমন সমগ্র বিশ্বের শিক্ষকদের শ্রদ্ধা জানাবো, একই সাথে গোটা বিশ্বে শিক্ষকদের সম্মান ও সংকট কতোখানি সেটাও পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। আসলে শিক্ষকতা কোনো পেশা নয়, একটি পরম্পরা। কিন্তু এই পরম্পরাকে পৃথিবীর সব দেশ এক চোখে দেখে না। কোথাও শিক্ষক ঈশ্বরতুল্য, কোথাও তিনি নিতান্তই এক বেতনভুক কর্মচারী। এই ভিন্নতাই ধরা পড়েছে আন্তর্জাতিক সমীক্ষাগুলোতে।
২০১৮ সালে Varkey Foundation ৩৫টি দেশের ৩৫,০০০ মানুষের ওপর যে সমীক্ষা চালায়- তার নাম Global Teacher Status Index। সেই রিপোর্ট আজও এই বিষয়ে সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক ভিত্তি। সেখানে দেখা যায়- চীনে শিক্ষকদের সম্মান সবচেয়ে বেশি। ৮১ শতাংশ মানুষ বিশ্বাস করেন যে ছাত্ররা শিক্ষকদের সম্মান করে, যেখানে আন্তর্জাতিক গড় মাত্র ৩৬ শতাংশ। চীনে শিক্ষককে ডাক্তারের সমতুল্য মর্যাদা দেওয়া হয়। চীনের পরেই রয়েছে মালয়েশিয়া, তাইওয়ান, রাশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া ও ভারত। ভারত ৮ নম্বরে। লক্ষণীয় বিষয় হলো- প্রথম দশটি দেশের মধ্যে সাতটিই এশিয়ার। এর বিপরীত চিত্র ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকায়। ব্রাজিল, ইসরায়েল, ইতালি, ঘানা, আর্জেন্টিনা, স্পেন- এই দেশগুলোতে শিক্ষকদের মর্যাদা সূচক সবচেয়ে নীচে।
এশিয়ায় শিক্ষকদের এতো সম্মান কেনো? এর উত্তর লুকিয়ে আছে সংস্কৃতিতে। কনফুসীয় দর্শনে পাঁচটি মূল সম্পর্কের একটি হলো শিক্ষক-ছাত্র সম্পর্ক, সেখানে শিক্ষককে পিতার সমতুল্য মনে করা হয়। তাই চীন, কোরিয়া, জাপানে শিক্ষককে বলা হয় laoshi বা sensei, যার মানে শুধু পেশা নয়, একটি নৈতিক অবস্থান। ভারতীয় সংস্কৃতিতে বলা হয় গুরু ব্রহ্মা, গুরু বিষ্ণু, গুরুদেব মহেশ্বর। এই শ্রদ্ধাবোধ সমাজের রন্ধ্রে মিশে আছে। তাই এই দেশগুলোতে এখনও সবচেয়ে মেধাবী ছাত্ররাই শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেয়। সিঙ্গাপুরে শিক্ষক হতে গেলে টপ ৩০ শতাংশ গ্র্যাজুয়েট হতে হয়, দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রাথমিক শিক্ষকের চাকরি পাওয়া অত্যন্ত কঠিন। PISA পরীক্ষায় এই দেশগুলোর ধারাবাহিক সাফল্যের পেছনেও এই সম্মানের সংস্কৃতি কাজ করে।
এর বিপরীতে পশ্চিমে শিক্ষাকে দেখা হয় সার্ভিস হিসেবে, গুরু-শিষ্য পরম্পরা হিসেবে নয়। সেখানে শিক্ষক একজন কারিকুলাম ডেলিভারি করেন এমন কর্মচারী। সমীক্ষায় দেখা গেছে- ব্রিটেনে শিক্ষকদের বেতন ন্যায্য বলে মনে করেন এমন মানুষের সংখ্যা ২০১৩ সালে ৭৪ শতাংশ থেকে ২০১৮ সালে ৩৪ শতাংশে নেমে এসেছে। ফিনল্যান্ডের মতো দেশেও এই হার ৮০ শতাংশ থেকে ২১ শতাংশে নেমেছে। অর্থাৎ মানুষ বুঝতে পারছেন- শিক্ষকদের কম বেতন দেওয়া হচ্ছে। ফিনল্যান্ড অবশ্য ব্যতিক্রম। সেখানে বেতন খুব বেশি নয়, কিন্তু স্বাধীনতা সবচেয়ে বেশি। শিক্ষক কী পড়াবেন, কীভাবে পড়াবেন, তা তিনিই ঠিক করেন। তাই সেখানে শিক্ষকতা এখনও সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত পেশা।
২০২৫ ও ২০২৬ সালের রিপোর্ট এই ছবিটাকে আরও গভীর করেছে। Varkey Index-এর নতুন এডিশন না এলেও UNESCO ২০২৪ সালে প্রথমবার Global Report on Teachers প্রকাশ করে, যার আপডেটেড লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ান এডিশন বের হয় ২০২৫ সালের এপ্রিলে এবং ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত সেটাই অফিসিয়াল রোডম্যাপ। সেই রিপোর্ট বলছে- ২০৩০ সালের মধ্যে সার্বজনীন শিক্ষার জন্য বিশ্বে ৪৪ মিলিয়ন শিক্ষক লাগবে, এর মধ্যে সাব-সাহারান আফ্রিকায় ১৫ মিলিয়ন, দক্ষিণ এশিয়ায় ১০ মিলিয়ন, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় ৪.৮ মিলিয়ন এবং লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ানে ৩.২ মিলিয়ন (১ মিলিয়ন = ১০ লাখ)। এই ঘাটতির ৯০ শতাংশই শিক্ষক পেশা ছেড়ে দেওয়ার জন্য। ২০১৫ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে প্রাথমিক স্তরে শিক্ষকদের পেশা ছাড়ার হার ৪.৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ৯ শতাংশ হয়েছে, অর্থাৎ প্রায় দ্বিগুণ। কারণ একই- অতিরিক্ত কাজের চাপ, ২০-৩০ শতাংশ কম বেতন এবং স্বীকৃতির অভাব। এই সংকট মোকাবিলায় ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সান্তিয়াগোতে প্রথম World Summit on Teachers হয়।
OECD Education at a Glance ২০২৫ ও ২০২৬ এই সংকটকে উন্নত দেশের চোখে দেখিয়েছে। ২০২৬ সালের রিপোর্টের ফোকাসই ছিলো Teacher Shortages। রিপোর্ট বলছে- খালি পদের হার গড়ে ৪ শতাংশের কম মনে হলেও সংকটটি নির্দিষ্ট বিষয় ও এলাকায় কেন্দ্রীভূত। ১৬টি দেশের মধ্যে ১১টিতেই মাধ্যমিক স্তরে গণিত ও বিজ্ঞানের যোগ্য শিক্ষকের অভাব আছে। ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে OECD দেশগুলোতে গড়ে ৯ শতাংশ শিক্ষক পুরোপুরি যোগ্য নন, চিলি, ডেনমার্ক, এস্তোনিয়া, জার্মানিতে এই হার ১৮ শতাংশের বেশি, যেখানে জাপান ও কোরিয়ায় ১০০ শতাংশ যোগ্যতা বাধ্যতামূলক। PISA 2025 রিপোর্টেও বলা হয়েছে- ২০২৫ সালে ৪০ শতাংশ পনেরো বছর বয়সী ছাত্র এমন স্কুলে পড়ে যেখানে প্রধান শিক্ষক বলছেন শিক্ষক সংকটে পঠনপাঠন ব্যাহত হচ্ছে, ২০১৮ সালে এই হার ছিলো ২৭ শতাংশ। সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্য- OECD দেশগুলোতে গড়ে ৮৫ শতাংশ শিক্ষক বলছেন তাঁরা চাকরিতে সন্তুষ্ট, কিন্তু মাত্র ২২ শতাংশ মনে করেন সমাজে শিক্ষকতা মূল্যবান পেশা হিসেবে দেখা হয়। OECD-র ২০২৬ সালের আরেকটি Working Paper বলছে- এই ঘাটতি পূরণে second-career teacher অর্থাৎ অন্য পেশা থেকে আসা শিক্ষক এখন গুরুত্বপূর্ণ, নিম্ন মাধ্যমিকে ১৯ শতাংশ শিক্ষকই second-career, নতুন শিক্ষকদের মধ্যে ২৬ শতাংশ।
ভারতের জন্য শিক্ষা মন্ত্রকের ২০২৫-২৬ এর তথ্য বলছে- প্রাথমিকে ৯১.২ শতাংশ পদে শিক্ষক আছেন যা ২০১৩-১৪ সালে ছিলো ৬৪.৬৮ শতাংশ, অর্থাৎ সংখ্যায় উন্নতি হয়েছে, কিন্তু গুণগত সংকট ও গ্রামীণ এলাকায় বিজ্ঞান শিক্ষকের অভাব থেকেই গেছে।
শিক্ষকদের সম্মান কোনো সরকারি পুরস্কার বা একটি দিবস দিয়ে মাপা যায় না। যে দেশ তার শিক্ষককে যত বেশি সুযোগ, নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা দেবে, সেই দেশের ভবিষ্যৎ ততো উজ্জ্বল হবে। ২০১৮ সালের তত্ত্ব ছিলো সংস্কৃতি বনাম বেতন, ২০২৫-২৬ সালের নতুন তত্ত্ব হলো বয়স ও যোগ্যতা। এশিয়ায় এখনও সম্মান বেশি, কিন্তু সেখানেও শিক্ষকের গড় বয়স বাড়ছে, আর ইউরোপে সম্মান কম হওয়ার সাথে যোগ হয়েছে STEM শিক্ষক সংকট। তাই এখন সংকটটা আর শুধু সম্মানের নয়, এটি যোগ্য শিক্ষককে ধরে রাখার সংকট। কারণ শিক্ষক কেবল পাঠ্যবই পড়ান না, তিনি একটি জাতির ভাবনার ভিত্তি তৈরি করেন।
About The Writer:
Sri Raja Debroy
Born on May 18th in Agartala, renowned writer, philosopher, and tabla player Raja Debroy writes across multiple genres and languages. A member of the London Poets Club, his published works include -
- 150 Years of Umakanta Academy,
- Chhandapatan ,
- Char Line Hoye Jak,
- Electoral Reforms ,
- Thoughtful Poems,
- and Kalpana Ki Duniya ( Hindi)