১৯৩২ সালে \\\'পথের কাঁটা\\\' গল্পে প্রথম এলেন ব্যোমকেশ। শেষ গল্প \\\'বিশুপাল বধ\\\' অসমাপ্ত থেকে যায়। ২২ সেপ্টেম্বর ১৯৭০ সালে পুনেতে হৃদরোগে তাঁর প্রয়াণ। সেদিন তিনি লিখছিলেন ব্যোমকেশেরই একটি গল্প। শরদিন্দু শুধু গোয়েন্দা লেখক নন। তিনি একসঙ্গে ঐতিহাসিক ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, চিত্রনাট্যকার।
বাংলা সাহিত্যে গোয়েন্দা অনেক আছেন। কিন্তু ব্যোমকেশ আলাদা, কারণ শরদিন্দু তাঁকে গোয়েন্দা বলেননি, বলেছেন- সত্যান্বেষী। পার্থক্যটা দর্শনের। শার্লক হোমস অপরাধ খোঁজেন, ব্যোমকেশ সত্য খোঁজেন। হোমসের কাছে অপরাধ একটি ধাঁধা, ব্যোমকেশের কাছে অপরাধ একটি মানবিক ট্র্যাজেডি। তাই ব্যোমকেশের গল্পে খুনের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে খুনের মোটিভ।
তাঁর অস্ত্র তিনটি- পর্যবেক্ষণ নয়, মনস্তত্ত্ব, যুক্তি এবং করুণা। তিনি অপরাধীকে ঘৃণা করেন না, বোঝার চেষ্টা করেন। \\\'চিত্রচোর\\\' বা \\\'অর্থমনর্থম\\\' পড়লে দেখবেন, অপরাধী ধরা পড়ার পর ব্যোমকেশের চোখে জল। এই করুণাই তাঁকে বাঙালি করে তোলে। একজন গোয়েন্দা সংসার করে, বাজার করে, সত্যবতীর সঙ্গে ঝগড়া করে- বিশ্ব সাহিত্যে এমন উদাহরণ বিরল। শরদিন্দু গোয়েন্দাকে সুপারম্যান থেকে মানুষে নামিয়ে আনলেন। অজিতের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। অজিত ওয়াটসন নন, তিনি বাঙালি পাঠকের প্রতিনিধি। অজিতের চোখ দিয়েই আমরা ব্যোমকেশকে দেখি, সন্দেহ করি, ভালোবাসি।
শরদিন্দুর মূল দর্শন হলো- অপরাধের শিকড় লোভ, কাম এবং অহংকারে। তাঁর প্রায় প্রতিটি গল্প ফ্রয়েডীয় তত্ত্বের ওপর দাঁড়িয়ে। \\\'পথের কাঁটা\\\'য় বিজ্ঞাপনের আড়ালে খুন- লোভ। \\\'সীমন্ত হীরা\\\'য় হীরার প্রতি কাম। \\\'মাকড়সার রস\\\'-এ পুরুষের অহংকার। যৌনতাকে তিনি শিল্পের পর্যায়ে উন্নীত করেছেন। তবে তিনি বিশ্বাস করতেন- মানুষ অপরাধী হয়ে জন্মায় না, পরিস্থিতি তাঁকে অপরাধী বানায়। তাই তাঁর গল্পে ডিটেকশন শেষ কথা নয়, শেষ কথা হলো ন্যায়। অনেক সময় তিনি অপরাধীকে পুলিশে দেন না, অনুতাপের আগুনে পুড়তে দেন। এটি ভারতীয় দর্শনের \\\'প্রায়শ্চিত্ত\\\' তত্ত্ব। ঐতিহাসিক উপন্যাসে তাঁর তত্ত্ব আরও স্পষ্ট- ইতিহাস মানে রাজা-রানী নয়, ইতিহাস মানে সাধারণ মানুষের জীবন। \\\'তুঙ্গভদ্রার তীরে\\\' বিজয়নগর সাম্রাজ্যের পতনের পটভূমিতে দুটি সাধারণ নর-নারীর প্রেম- ইতিহাসকে তিনি ব্যক্তিগত করে দেন।
শরদিন্দু কেনো আজও প্রাসঙ্গিক? প্রথমত- তিনি বাংলা ভাষায় আধুনিক ক্রাইম ফিকশনের ব্যাকরণ তৈরি করেন। তার আগে গোয়েন্দা গল্প ছিলো ঘটনা-সর্বস্ব। তিনি আনলেন যুক্তির শৃঙ্খলা। দ্বিতীয়ত- তিনি নারী চরিত্রে বিপ্লব আনেন। সত্যবতী কেবল স্ত্রী নয়, সে যুক্তি দেয়, ব্যোমকেশকে চ্যালেঞ্জ করে। \\\'রক্তমুখী নীলা\\\'র মতো গল্পে নারীই মূল চালিকাশক্তি।
আজ OTT-র যুগে ব্যোমকেশের এতো জনপ্রিয়তা কেনো? কারণ ব্যোমকেশ বাঙালির আত্ম-প্রতিচ্ছবি। সে ধুতি-পাঞ্জাবি পরা, চা খায়, সিগারেট খায়, কিন্তু তাঁর মস্তিষ্ক ক্ষুরধার। সে বাঙালিকে বিশ্বাস করায়- আমরাও পারি।