আমরা তাঁকে নবজাগরণের জনক বলি, কিন্তু এই কথাটা তাঁকে ছোটো করে। তিনি নবজাগরণের জনক নন, তিনি ছিলেন ভারতের প্রথম ডিকোডার। তিনি তিনটে ধর্মকে ডিকোড করেছিলেন।
রামমোহনের জীবনের প্রথম আঘাত ধর্ম থেকে নয়, ধর্মগ্রন্থ থেকে এসেছিলো। ১৫ বছর বয়সে তিনি তুহফাত-উল-মুওয়াহহিদিন লিখলেন ফারসি ভাষায়। নামের অর্থ- একেশ্বরবাদীদের উপহার। সেখানে তিনি এক ভয়ংকর প্রশ্ন করলেন- হিন্দু মূর্তি পুজো করেন, খ্রিস্টান ত্রিত্ববাদে বিশ্বাস করেন, মুসলমান হজ করেন- সবাই বলেন আমারটাই সত্য। তাহলে সত্য কয়টা? তাঁর উত্তর ছিলো- ধর্ম অনেক, ঈশ্বর এক। মূর্তি, গির্জা, মসজিদ- এগুলো ঈশ্বরের ভাষা নয়, মানুষের ভাষা। ঈশ্বরের ভাষা একটাই- বিবেক।
এই জন্য তিনি বেদান্তকে ধরলেন। কারণ উপনিষদে মূর্তি নেই, শুধু ব্রহ্ম আছে- একমেবাদ্বিতীয়ম। তাই তিনি বেদান্ত গ্রন্থ বাংলায় অনুবাদ করলেন। আজকের ভাষায় একে বলে- Internal Reform- বাইরে থেকে আক্রমণ নয়, ভেতর থেকে শুদ্ধিকরণ।
১৮১১ সালে তাঁর নিজের বৌদিকে সতী হতে দেখলেন। এই দৃশ্য তাঁকে পাল্টে দিলো। কিন্তু তিনি ইংরেজের কাছে গিয়ে কাঁদলেন না। তিনি করলেন উল্টোটা। তিনি মনুসংহিতা, পরাশর সংহিতা ঘেঁটে প্রমাণ করলেন- সতীদাহ হিন্দু ধর্মই নয়। এটা পরবর্তীকালে ঢুকে যাওয়া এক প্রথা। তিনি ১৮১৮ সালে প্রমাণ দাখিল করলেন- বেদে বিধবার সহমরণের কোনো বিধান নেই, বরং বিধবার ব্রহ্মচর্য পালনের বিধান আছে।
তাই ১৮২৯ সালের ৪ঠা ডিসেম্বর লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক যখন সতীদাহ নিষিদ্ধ করলেন (Regulation XVII), তখন রামমোহন উল্লাস করেননি, তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন। তিনি প্রমাণ করলেন- সংস্কার মানে ধর্মকে অপমান নয়, ধর্মের আসল রূপকে ফিরিয়ে আনা।
১৮২৮ সালের ২০ আগস্ট তিনি ব্রাহ্মসমাজ প্রতিষ্ঠা করলেন। অনেকে ভাবে এটা নতুন ধর্ম। ভুল। এটা নতুন ধর্ম নয়, এটা সব ধর্মের কমন প্ল্যাটফর্ম। ব্রাহ্মসমাজে কোনো মূর্তি ছিলো না, কোনো পুরোহিততন্ত্র ছিলো না। যে কোনো জাত, যে কোনো ধর্মের মানুষ বসতে পারতো। তিনি বললেন- ঈশ্বরকে ডাকতে ব্রাহ্মণ লাগে না, বিবেক লাগে।
এটাই তাঁকে রাজা বানিয়েছে। ১৮৩০ সালে মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় আকবর তাঁকে রাজা উপাধি দিয়ে ইংল্যান্ডে পাঠালেন দূত হিসেবে। একজন হিন্দু ব্রাহ্মণ, মুঘল সম্রাটের দূত হয়ে খ্রিস্টান দেশে যাচ্ছেন- এর চেয়ে বড় Secularism ইতিহাসে আর নেই।
তাই রামমোহন রায়ের (বন্দ্যোপাধ্যায়ের) প্রয়াণ দিবস শোকের নয়, বোধনের। তিনি মারা গিয়েছিলেন ব্রিস্টলে, ইংল্যান্ডের মাটিতে, কিন্তু তাঁকে কবর দেওয়া হয়নি, পোড়ানোও হয়নি। তাঁকে সমাহিত করা হয়েছিলো- কারণ তিনি কোনো একটা ধর্মের ছিলেন না, তিনি সব ধর্মের ওপরে ছিলেন।
About The Writer:
Sri Raja Debroy
Born on May 18th in Agartala, renowned writer, philosopher, and tabla player Raja Debroy writes across multiple genres and languages. A member of the London Poets Club, his published works include -
- 150 Years of Umakanta Academy,
- Chhandapatan ,
- Char Line Hoye Jak,
- Electoral Reforms ,
- Thoughtful Poems,
- and Kalpana Ki Duniya ( Hindi)