আয়নার ভেতর অন্য মুখ
শিকদার বাসির
সন্ধ্যার পর শহরটা যেন অন্য রূপ নেয়। আলো-আঁধারির ফাঁকে অনেক গোপন গল্প জন্ম নেয়, যেগুলো দিনের আলো সহ্য করতে পারে না। সায়েমা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। হাতে ফোন, স্ক্রিনে ভেসে উঠছে একটি নাম। রাশেদ। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার স্বামী নাবিল খারাপ মানুষ ছিল না। দায়িত্বশীল, নির্লিপ্ত, নিয়মমাফিক জীবনযাপনকারী একজন মানুষ। সংসারে কোনো অভাব ছিল না, শুধু একটা জিনিস ছাড়া, মনের কথা বলার মানুষ। রাশেদের সঙ্গে পরিচয়টা হয়েছিল এক সাহিত্য আসরে। কথার ভেতর ছিল উষ্ণতা, মনোযোগ, আর অদ্ভুত এক বোঝাপড়া। প্রথমে কয়েকটা মেসেজ, তারপর নিয়মিত কথা। সায়েমা অনুভব করল, তার ভেতরের এক শূন্য জায়গা ধীরে ধীরে ভরে উঠছে। কিন্তু সেই ভরাটটাই ছিল অন্য এক শূন্যতার শুরু। একদিন রাশেদ বলল, “তুমি কি কখনো ভেবেছ, আমরা যদি অন্যভাবে দেখা করতাম?”
সায়েমা চুপ করে ছিল। সে জানত, এই ‘অন্যভাবে’ কথাটার ভেতরেই লুকিয়ে আছে ভুলের দরজা।
তবুও দরজাটা খুলে গেল। দিন গড়াতে লাগল। গোপন দেখা, লুকানো কথা, অজুহাতে বের হওয়া। সবকিছু মিলিয়ে একটা আলাদা জগৎ তৈরি হলো। সেখানে ছিল না কোনো দায়বদ্ধতা, ছিল শুধু অনুভূতির ঢেউ। কিন্তু ঢেউ যত উঁচু হয়, ভাঙনও তত বড় হয়। এক রাতে নাবিল অসুস্থ হয়ে পড়ল। হঠাৎ বুকের ব্যথা নিয়ে হাসপাতালে নিতে হলো। সায়েমা ছুটে গেল। আইসিইউর বাইরে দাঁড়িয়ে সে প্রথমবারের মতো ভয় পেল, কিছু হারানোর ভয়। ডাক্তার বলল, “সময়মতো এনেছেন, নাহলে বিপদ হতে পারত।”
নাবিলের হাতটা ধরে বসে থাকল সায়েমা। সেই হাত, যেটা এতদিন শুধু দায়িত্বের মনে হয়েছিল, আজ হঠাৎ করে ভরসার মতো লাগছে। তার ফোনটা কাঁপছিল। রাশেদের কল। সে ফোনটা বন্ধ করে দিল। সেই মুহূর্তে হাসপাতালের করিডরের একপাশে একটা বড় আয়না ছিল। সায়েমা নিজের দিকে তাকাল। চোখের নিচে ক্লান্তি, মুখে অপরাধবোধ; আর একটা অপরিচিত মানুষ।
সে ফিসফিস করে বলল, “এ আমি না…”
পরদিন ভোরে নাবিল একটু সুস্থ হলে সায়েমা তার পাশে বসে ধীরে ধীরে বলল, “আমি তোমার সঙ্গে কথা বলতে চাই… অনেক কথা।”
তার কণ্ঠ কাঁপছিল, কিন্তু ভেতরে এক অদ্ভুত দৃঢ়তা জন্ম নিয়েছে। সেদিনই সে রাশেদকে শেষবারের মতো একটি মেসেজ পাঠাল,
“আমাদের গল্প এখানেই শেষ হওয়া উচিত।”
কিছু গল্প শেষ না হলে মানুষ নিজেকেই হারিয়ে ফেলে। সায়েমা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আবার আয়নায় তাকাল। এবার তার চোখে অপরাধবোধের পাশাপাশি একটা স্পষ্টতা আছে।যেন সে নিজের মুখটা আবার চিনতে শুরু করছে।
Discussion