দুর্গাপূজার ঐতিহাসিক চালচিত্র

রাজা দেবরায়

দুর্গাপূজা কবে শুরু হয়েছিলো তা কেউ জানেন না। এর কারণ হিন্দু ধর্ম কোনো একদিনে বা একজন অবতারের হাতে তৈরি হয়নি। সিন্ধু সভ্যতায় মাতৃকা মূর্তি পাওয়া গেছে, দ্রাবিড় সমাজে মাতৃতান্ত্রিক পূজার প্রমাণ আছে, কিন্তু তাকে দুর্গাপূজা বলা যায় না। শাস্ত্রে দুর্গার প্রথম উল্লেখ আসে মার্কণ্ডেয় পুরাণের শ্রীশ্রীচণ্ডীতে। সেখানে রাজা সুরথ ও সমাধি বৈশ্য বসন্তকালে দেবীর মৃন্ময়ী মূর্তি গড়ে পূজা করেন। তাই আদি দুর্গাপূজা ছিলো বাসন্তী। আজও চৈত্র মাসে বাসন্তী পূজা হয়।

তাহলে শরৎকালে পূজা এলো কোথা থেকে? এর উত্তর আছে- কৃত্তিবাসী রামায়ণে, বাল্মীকিতে নেই। রামচন্দ্র রাবণ বধের আগে শরৎকালে দেবীকে অকালে জাগিয়েছিলেন, তাই এর নাম অকালবোধন। বাল্মীকি রামায়ণে অকালবোধনের কোনো উল্লেখ নেই, এটি পরবর্তীকালের সংযোজন। বাংলায় বসন্ত থেকে শরতে পূজা সরার পেছনে বড়ো কারণ- কৃষি অর্থনীতি। বসন্তে প্রকৃতি ফুলে-ফলে ভরা, রাজা-জমিদারদের হাতে খাজনার টাকা। তাই তাঁরা বসন্তেই জাঁকজমক করে পূজা করতেন। শরৎ ছিল বাংলার কৃষকের অভাবের মাস। ভাদ্র-আশ্বিনে বন্যা, মজুত ধান শেষ, ঋণের দায়ে জমি বন্ধক। শরতে তাঁর উৎসব করার সামর্থ্য ছিলো না। তাই শরতের পূজা ছিলো মূলত জমিদার-মহাজনদের। পরে নিবিড় চাষ ও নতুন ফসলের (আমন ধানের চাষ বাড়ার) কারণে শরতেও কৃষকের হাতে কিছু পয়সা আসতে শুরু করলে এই পূজা গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে।

বাংলায় প্রথম দুর্গাপূজা কে করেন তা নিয়ে তিনটি জনশ্রুতি আছে। প্রথম- রাজশাহীর তাহেরপুরের রাজা কংসনারায়ণ ১৫৮৩ সালে ৯ লক্ষ টাকা খরচ করে প্রথম সাড়ম্বরে পূজা করেন (এটি ভবানন্দের লেখা এবং পরে ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গলে উল্লিখিত)। দ্বিতীয়- বিষ্ণুপুরের মল্ল রাজবাড়িতে ৯৯৭ খ্রিস্টাব্দে পূজা শুরু। দুটোই লোকশ্রুতি, কোনো তাম্রশাসন বা সরকারি দলিলে এর প্রমাণ নেই। বরং প্রমাণিত প্রাচীন পূজা হলো বড়িশার সাবর্ণ রায়চৌধুরী বাড়ির পূজা যা ১৬১০ সাল থেকে চলছে। বাংলায় পাল আমলে বৌদ্ধধর্মের প্রভাবে মূর্তিপূজা প্রায় বন্ধ ছিলো। সেন আমলে, বিশেষ করে বল্লাল সেনের সময় ফের মূর্তিপূজার চল শুরু হয়। তখনও দশভুজা সিংহবাহিনী মূর্তি ছিলো না। গ্রামে সুবচনী, মঙ্গলচণ্ডী, শীতলা, মনসার ঘটপূজা হতো।

দুর্গাপূজার চরিত্র বদলে যায় ১৭৫৭ সালে। পলাশীর যুদ্ধে সিরাজ-উদ-দৌলাকে হারিয়ে ইংরেজদের জেতাতে সাহায্য করেছিলেন জগৎ শেঠ, উমিচাঁদ, মীরজাফর এবং তাঁদের মুন্সি রাজা নবকৃষ্ণ দেব। ওয়ারেন হেস্টিংসের ফার্সি শিক্ষক থেকে মুন্সি, তারপর রাজা হওয়া নবকৃষ্ণ পলাশীর কয়েক মাসের মধ্যেই শোভাবাজার রাজবাড়িতে এক বিশাল দুর্গাপূজার আয়োজন করেন। তিনি তাঁর এক বন্ধুকে চিঠিতে লেখেন- \\\"এবার পুজোর সময় লর্ড ক্লাইভ আমার বাটিতে অনুগ্রহপূর্বক প্রতিমা দর্শন করিতে আসিবেন।\\\" সেই পূজায় ফোর্ট উইলিয়াম থেকে কামান দাগা হয়, আর্মি ব্যান্ড বাজে, জুতো পরেই সাহেবরা মণ্ডপে ঢোকেন, মদ ও বাঈজি নাচের আসর বসে। ফ্যানি পার্কস লিখেছেন- \\\"মণ্ডপের পাশের বড় ঘরে ইউরোপীয় অতিথিদের জন্য মেসার্স গান্টার অ্যান্ড হুপার প্রচুর খাদ্য, বরফ ও ফরাসি মদ সরবরাহ করেছিলেন।\\\" বঙ্গদূত পত্রিকায় ১৮২৯ সালে খবর বেরোয়- গভর্নর জেনারেল লর্ড বেন্টিঙ্ক নবমীর রাতে শোভাবাজারে এসে দুই দণ্ড নাচ-গান দেখেছেন। তাই দেশপ্রেমিকরা একে বলতেন \\\"বেইমানের পূজা\\\"।

বিনয় ঘোষ তাঁর কলকাতা কালচার বইয়ে এই পর্বকে বলেছেন- \\\"গ্র্যান্ড ফীস্ট অফ দি জেন্টুস\\\"। তাঁর ভাষায়- \\\"ব্রিটিশ আমলের নতুন জমিদার ও হঠাৎ গজিয়ে ওঠা বিত্তবান জেন্টুরা যে জোয়ার আনার চেষ্টা করেছিলেন, সেটা স্বাভাবিক জোয়ার নয়, অস্বাভাবিক বন্যা, পাঁক ও আবর্জনাই ছিল তার মধ্যে বেশি।\\\" এর পর থেকেই কলকাতায় সাহেবদের খুশি করতে পূজায় খরচের প্রতিযোগিতা শুরু হয়। সমাচার দর্পণ ১৮১৯ সালে লিখেছে- কলকাতায় নিকি নামে এক বাঈজিকে এক বাবু হাজার টাকা মাস মাইনে দিয়ে রেখেছেন, যখন ৪-৫ টাকায় একান্নবর্তী পরিবার চলে যেত। ক্ষিতীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রবি ঠাকুরের ভাইপো, বিসর্জনের বর্ণনায় লিখেছেন- বাবুরা অত্যধিক মদ্যপান করে কানে খড়কে দিয়ে পান চিবোতে চিবোতে অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি করে প্রতিমার সঙ্গে যেতেন।

এই বাবু কালচার থেকে পূজা কীভাবে সাধারণ মানুষের হলো? তার সূত্র নদিয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র। তিনি ১৭২৮ সালে সিংহাসনে বসার পর দুর্গাপূজাকে জমিদার বাড়ি থেকে বাইরে আনেন। হুতোম লিখেছেন- \\\"রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের আমল হইতেই বাংলায় দুর্গোৎসবের প্রাদুর্ভাব বাড়ে, পূর্বে রাজারাজড়া ও বনেদী মানুষদের বাড়িতেই কেবল দুর্গোৎসব হইত।\\\" গ্রামে তখনও স্থায়ী আটচালায় একচালা প্রতিমা হতো, গুরুমশাইয়ের পাঠশালার ছেলেরা ঢাকের আওয়াজে পড়া ভুলে যেতো। তারপর আসে বারোয়ারি পূজা। বারো জন ইয়ার বা বন্ধু মিলে যে পূজা, তাই বারোয়ারি। প্রথম বারোয়ারি পূজা ১৭৯০ সালে হুগলির গুপ্তপাড়ায়, নদিয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের অনুপ্রেরণায়- যখন ব্রাহ্মণদের দুর্গাপূজায় শুদ্রদের ঢুকতে না দেওয়ায় বারোজন বন্ধু আলাদা পূজা করেন।

দুর্গা নামের অর্থেও এই মিশ্রণ আছে। শব্দকল্পদ্রুম অনুযায়ী- \\\'দ\\\' অক্ষর দৈত্যনাশক, উ-কার বিঘ্ননাশক, রেফ রোগনাশক, গ অক্ষর পাপনাশক, আ-কার ভয়শত্রুনাশক। আবার দুর্গ নামক অসুরকে যিনি বধ করেন তিনিই দুর্গা। চণ্ডীতে তিনি সকল দেবতার সম্মিলিত মহাশক্তি। তাই তাঁর পূজায় বৈদিক, তান্ত্রিক, পৌরাণিক, লৌকিক সব ভাবের সমন্বয় ঘটেছে। নবপত্রিকা হলো আসলে নয়টি উদ্ভিদ- কলা, কচু, হরিদ্রা, জয়ন্তী, বিল্ব, দাড়িম্ব, অশোক, মান, ধান- যা শস্যদেবীর প্রতীক। একে আমরা কলাবউ বলি, কিন্তু এটি গণেশের বউ নয়, এটি দুর্গারই আরেক রূপ।

আজ যখন আলো ও থিমের চোখ ধাঁধানো মণ্ডপে আমরা প্রতিমা দেখি, তখন মনে রাখতে হবে এই উৎসব একদিনে তৈরি হয়নি। এটি বসন্ত থেকে শরতে এসেছে, রাজপ্রাসাদ থেকে পাড়ার মাঠে নেমেছে, বাঈজি নাচ থেকে আরতি প্রতিযোগিতায় বদলেছে। এর ভিতরে আছে কৃষকের অভাব, জমিদারের জৌলুস, বাবুর বিলাসিতা এবং সাধারণ মানুষের ভক্তি।