৬ অক্টোবর সন্ধ্যা, বুয়েনস আইরেস। আমাদের দেশে সেটা ৭ অক্টোবর ভোরে। রিভার প্লেটের এস্তাদিও মনুমেন্টালে ৮৫,০০০ মানুষের সামনে আর্জেন্টিনা বনাম বেনিন। এটাই লিওনেল আন্দ্রেস মেসি কুচ্চিত্তিনি-র দেশের জার্সিতে শেষ ম্যাচ, The Last Tango। আগস্টের শেষে তিনি আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছিলেন। AFA তাঁকে সম্মান জানাতে এই বিদায়ী ম্যাচের আয়োজন করেছে- Gracias, Leo Fan Fest, বিশেষ জার্সি, ২০২২ বিশ্বকাপ জয়ী দলের সবাইকে আমন্ত্রণ। এই ম্যাচে তাঁর ২০৮তম এবং শেষ ক্যাপ হবে।
সংখ্যা দিয়ে মেসিকে মাপা যায় না, তবু সংখ্যা না বললে ইতিহাস অসম্পূর্ণ থাকে। আর্জেন্টিনার জার্সিতে ২০৭ ম্যাচে ১২৫ গোল, দেশের সর্বকালের সর্বোচ্চ। সব মিলিয়ে ক্যারিয়ারে ৯৩১ গোল ছাড়িয়েছে গত সপ্তাহে। এর মধ্যে ফ্রি-কিকে ৭৬ গোল। ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, কলোম্বাস ক্রুর বিরুদ্ধে ডানদিকের টাচলাইন ঘেঁষে প্রায় অসম্ভব কোণ থেকে বাঁ পায়ে যে গোলটি করলেন, সেটিই ৭৬তম। এখন তিনি মার্সেলিনহো কারিওকার ৭৮ গোলের সর্বকালের রেকর্ড থেকে মাত্র দুই গোল দূরে। ২০১৭ সালে তাঁর ফ্রি-কিক ছিল ৩৪টি, রোনাল্ডোর ৫৩টি। তখন ইয়াহু স্পোর্টস লিখেছিলো- রোনাল্ডোর এই রেকর্ড মেসি কখনও ভাঙতে পারবেন না। মেসি ত্রিশের পর টেকনিক বদলে প্রমাণ করলেন- প্রতিভা বয়সে শুকায় না, ধারালো হয়। রোনাল্ডোর ফ্রি-কিক এখন ৬৪-৬৫টিতে আটকে।
মেসির ক্যারিয়ার তিনটি পর্বে ভাগ করা যায়। বার্সেলোনা ২০০৪-২০২১, ৭৭৮ ম্যাচে ৬৭২ গোল, ৫০টি ফ্রি-কিক। প্যারিস ২০২১-২০২৩, মানিয়ে নেওয়ার পর্ব। ইন্টার মায়ামি ২০২৩ থেকে, যেখানে ৩৯ বছর বয়সেও তিনি MLS-এ টানা তৃতীয় MVP-র দৌড়ে। কিন্তু দেশের জার্সিতে গল্পটা আলাদা। ২০১৪ বিশ্বকাপ ফাইনালে হার, ২০১৫ ও ২০১৬ কোপায় ফাইনালে হার। অবসর ঘোষণা, ফিরে আসা। তারপর ২০২১ কোপা আমেরিকা, ২০২২ বিশ্বকাপ, ২০২৪ কোপা এবং ২০২৬-এ ফাইনালে উঠে আবার হার। এই হার-জিতের আর্কটাই তাঁকে মানুষ করেছে, দেবতা নয়।
তাঁর গোলগুলোর দর্শন আছে। প্রথম দর্শন- ফ্রি-কিক। মেসির ফ্রি-কিক জোরের নয়, জ্যামিতির। তিনি দেয়ালকে দেখেন না, গোলকিপারের প্রত্যাশাকে দেখেন। কলোম্বাসের বিরুদ্ধে গোলটা ক্রস করার জায়গা ছিলো, সবাই ক্রস ভেবেছিলো, তিনি সরাসরি মারলেন। এটা প্রতারণা নয়, এটা পদার্থবিদ্যা। দ্বিতীয় দর্শন- ড্রিবল। মেসি দৌড়ান না, তিনি সময়কে ধীর করেন। প্রতিপক্ষ যখন পা ফেলেন, তিনি তখনও ভাবছেন। তৃতীয় দর্শন- তুলনা। রোনাল্ডো হলেন ইচ্ছাশক্তির দর্শন, আমি পারবো। মেসি হলেন স্বভাবের দর্শন, আমি আছি। একজন জিমে তৈরি, অন্যজন রাস্তায়। একজন গোলকে তাড়া করেন, অন্যজনের কাছে গোল নিজে আসে।
তাই ৬ অক্টোবর রাতটা শুধু ফুটবল নয়, একটি যুগের শেষ। AFA ১০ নম্বর জার্সি বেনিন ম্যাচের আগে খালি রেখেছে- বলিভিয়া ও বুরকিনা ফাসোর বিরুদ্ধে কেউ ১০ পরবে না, পরেওনি। ৭ অক্টোবর ভোর ৪:৩০-এ UNITE8 SPORTS অথবা Z5-এ যখন আমরা লাইভ দেখবো, তখন হয়তো দেখবো ৩৯ বছরের একজন মানুষ শেষবারের মতো তাঁর দেশের জাতীয় সঙ্গীতে চোখ বন্ধ করছেন এবং হয়তো কাঁদছেনও। তাঁর পায়ে হয়তো বিস্ফোরণ দেখা যাবে না, কিন্তু মাথায় এখনও মানচিত্র আছে। বিদায় মানে শেষ নয়, বিদায় মানে জায়গা খালি করা। ২০২৮ কোপা থেকে আর্জেন্টিনার ১০ নম্বর অন্য কেউ পরবে। হয়তো নিকো পাজ বা এনজো ফার্নান্ডেজ। কিন্তু যে শূন্যতা তৈরি হবে, তা জার্সি সংখ্যা দিয়ে ভরবে না, পরিসংখ্যান দিয়ে তো নয়ই। ভবিষ্যতে মেসি ফুটবল নিয়েই থাকবেন- ক্লাবের মালিক হয়ে বা হয়তো কোনো দেশের কোচ হয়ে, আর্জেন্টিনার প্রধান কোচও হতে পারেন হয়তো। তাঁর তিন ছেলেকেও প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন এবং দেবেন। আমাদের সৌভাগ্য যে মেসি যুগকে আমরা খুব কাছ থেকেই দেখতে পেয়েছি। একজন (মারাদোনার ক্ষেত্রেও তাই) মানুষের খেলার জন্য তাঁর দেশ বিশ্ববাসীর কাছে বিরাট সমীহ আদায় করেছে এবং করছে। ফুটবল ইতিহাসে মেসির অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
About The Writer:
Sri Raja Debroy
Born on May 18th in Agartala, renowned writer, philosopher, and tabla player Raja Debroy writes across multiple genres and languages. A member of the London Poets Club, his published works include -
- 150 Years of Umakanta Academy,
- Chhandapatan ,
- Char Line Hoye Jak,
- Electoral Reforms ,
- Thoughtful Poems,
- and Kalpana Ki Duniya ( Hindi)
Discussion