শব্দের আলোয় দেবীর বোধন

রাজা দেবরায়

মহালয়া মানে কী? আমরা অনেকেই ভাবি মহালয়া মানে দুর্গাপুজোর গান শুরু। আসলে শব্দটা ভাঙলেই মানে পাল্টে যায়। মহা + আলয় = মহালয়। মহা আলয় মানে মহান আশ্রয়। আর মহালয়া হলো সেই মহান আশ্রয়ের উৎসব। পিতৃপক্ষের শেষ, দেবীপক্ষের শুরু। যে দিনে পিতৃপুরুষেরা মহান আলয়ে যান এবং দেবী মহান আলয় থেকে মর্ত্যে আসেন।

এই দিনটার সঙ্গে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কোনো সম্পর্ক শাস্ত্রে নেই, কিন্তু বাঙালির মনে আছে। কীভাবে? ১৯৩১ সাল। অল ইন্ডিয়া রেডিও, কলকাতা কেন্দ্র। তখনও আকাশবাণী হয়নি। রেডিওতে একটা অনুষ্ঠান করার পরিকল্পনা হলো মহালয়ার ভোরে। নাম দেওয়া হলো \\\"মহিষাসুর মর্দিনী\\\"। রচনা করলেন বাণীকুমার (বৈদ্যনাথ ভট্টাচার্য), সুর দিলেন পঙ্কজ কুমার মল্লিক আর গ্রন্থনা ও স্তোত্রপাঠ করলেন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। প্রথম সম্প্রচার ১৯৩২ সালে। তখন লাইভ হতো। শিল্পীরা ভোররাতে গঙ্গা স্নান করে, ধুতি পরে, খালি পায়ে স্টুডিওতে আসতেন। 

১৯৭৬ সালে আকাশবাণী ভেবেছিলো বীরেন্দ্রকৃষ্ণের বদলে মহানায়ক উত্তম কুমারকে দিয়ে করাবে। অনুষ্ঠানের নাম দেওয়া হলো \\\"দেবীং দুর্গতিহারিণীম\\\"। সুর দিলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। কিন্তু বাঙালি তা মানেনি। আকাশবাণীর সামনে প্রতিবাদ, চিঠির বন্যা। পরের বছর থেকেই আবার ফিরে এলেন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ। সেই থেকে ৯৪ বছর ধরে, আজও মহালয়ার ভোর ৪টেয় বাজে সেই একই রেকর্ড। এটা পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলা রেডিও অনুষ্ঠানগুলোর একটি।

মহালয়ায় আমরা যা শুনি, তা আসলে শ্রী শ্রী চণ্ডীর সারাংশ। চণ্ডীতে ১৩টি অধ্যায়। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ সেই ১৩টি অধ্যায়কে দেড় ঘণ্টার শব্দচিত্রে বুনেছেন। এখানে তিনটি স্তর আছে। প্রথম স্তর- বোধন মন্ত্রঃ \\\"যা চণ্ডী মধুকৈটভাদি দৈত্যনিদলনী...\\\"। এর অর্থ শুধু দুর্গাকে জাগানো নয়, নিজের ঘুমন্ত চেতনাকে জাগানো। ভোর চারটেয় উঠে অন্ধকারে রেডিও শোনা মানে তমোগুণ থেকে সত্ত্বগুণে যাওয়া। শাস্ত্রে বলে ব্রাহ্মমুহূর্তে দেবীর বোধন হয়।

দ্বিতীয় স্তর- দর্শনঃ \\\"মহিষাসুর মর্দিনী\\\" শব্দের দর্শনটা গভীর। মহিষ মানে কী? মহিষ হলো জড়তা। যে নড়তে চায় না, ভাবতে চায় না, শুধু খায় আর ঘুমায়। মহিষাসুর মানে আমাদের ভেতরের সেই জড়তা যা রূপ বদলায়। কখনও সে লোভ, কখনও ভয়, কখনও অহংকার। তাই তাকে মারা কঠিন। চণ্ডীতে বলা হচ্ছে মহিষাসুর মরলে আবার তার ভেতর থেকে অন্য অসুর বের হয়। এর মানে একটা খারাপ অভ্যাস গেলে তার ভেতর থেকে আরেকটা বের হয়।

তৃতীয় স্তর- স্ত্রী শক্তিঃ সবচেয়ে বড় দর্শন হলো, এই যুদ্ধে কোনো পুরুষ দেবতা পারেননি। ব্রহ্মা, বিষ্ণু, শিব সবাই হেরে গেছেন। তখন তাঁদের সবার তেজ একত্রিত হয়ে এক নারী শক্তির জন্ম হলো। এর অর্থ- অশুভকে শুধু পেশী দিয়ে হারানো যায় না, তার জন্য প্রজ্ঞা, করুণা, ধৈর্য লাগে যা স্ত্রী শক্তির প্রতীক। দুর্গার দশ হাতে দশটি অস্ত্র মানে জীবনের দশটি দিকে দক্ষতা।

তাই মহালয়ার ভোরে আমরা যখন বীরেন্দ্রকৃষ্ণের কণ্ঠে শুনি- \\\"আশ্বিনের শারদ প্রাতে বেজে উঠেছে আলোক মঞ্জীর\\\", তখন আসলে আলোর নূপুর বাইরে নয়, আমাদের ভেতরে বাজে। অন্ধকারের পর আলো আসছে, এই বিশ্বাসটা ফিরে আসে। মহালয়া কোনো উৎসব নয়, একটি প্রস্তুতি। যুদ্ধের আগে নিজেকে তৈরি করা। পিতৃপুরুষকে জল দিয়ে, অতীতকে শ্রদ্ধা জানিয়ে, ভবিষ্যতের যুদ্ধের জন্য শক্তি সঞ্চয় করা। মহিষাসুর মর্দিনী তাই শুধু শোনার জিনিস নয়, দর্শনের জিনিস। চোখ বন্ধ করে শুনতে হয়, ভেতরের অসুরটাকে দেখতে হয়।