চণ্ডীদাস মালকে শুধু গায়ক বললে ভুল বলা হবে। তিনি ছিলেন একটি আর্কাইভ, একটি দর্শন। যে সময়ে বাংলা আধুনিক গান, সিনেমার গানের দিকে ঝুঁকছে, সেই সময়ে তিনি একা দাঁড়িয়ে বলেছিলেন- পুরনো গান পুরনো নয়, পুরনো গানই শেকড়। চণ্ডীদাস মালের প্রধান ক্ষেত্র ছিলো \\\'পুরাতনী বাংলা গান\\\'। এই গানগুলো রবি ঠাকুরের আগের বাংলার গান। নিধুবাবুর টপ্পা, রামনিধি গুপ্তের গান, দাশরথি রায়ের পাঁচালী। তিনি বিশ্বাস করতেন- এই গানগুলো হারিয়ে গেলে বাঙালি তাঁর কৈশোর হারিয়ে ফেলবে। তাই পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সঙ্গীত অ্যাকাডেমি যখন তাঁর কণ্ঠে ১০০টি টপ্পা ও পুরাতনী গান রেকর্ড করে আর্কাইভ করলো, সেটা ছিলো তাঁর দর্শনের জয়।

টপ্পা মূলত পাঞ্জাবের উটচালকদের গান যা পরে ওস্তাদ শোরি মিঞার হাতে শাস্ত্রীয় রূপ পায়। এটি অত্যন্ত কঠিন, ছোটো ছোটো মুর্কি, দ্রুত তানের কাজ। সাধারণত এটি খেয়াল ঘরানার ওস্তাদরাই গাইতেন। চণ্ডীদাস মাল এই টপ্পাকে বাংলার মাটিতে নামিয়ে আনলেন। তিনি টপ্পার কঠিন তানকে নরম করে, বাংলা কথার সাথে মিশিয়ে এমন এক গায়কী তৈরি করলেন যা একান্তই তাঁর নিজস্ব। এটাই ছিলো তাঁর মৌলিকত্ব- তিনি ঘরানা ভাঙেননি, ঘরানাকে অনুবাদ করেছেন।

তিনি শুধু গাননি, শিখিয়েছেন। রবীন্দ্রভারতী, বিশ্বভারতী, বেঙ্গল মিউজিক কলেজে পড়িয়েছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন- গান তালা বন্ধ করে রাখার জিনিস নয়, বিলিয়ে দেওয়ার জিনিস। চণ্ডীদাস মালের জীবন থেকে আমরা একটি বড় বিশ্লেষণ পাই। আজ আমরা বলি \\\'ফিউশন\\\', কিন্তু তিনি ফিউশনের উল্টোটা করেছিলেন- তিনি ছিলেন \\\'রুটস\\\' এর মানুষ। তিনি কৃষ্ণচন্দ্র দে-র কাছে ধ্রুপদ, জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষের কাছে ভজন, শৈলজারঞ্জনের কাছে রবীন্দ্রসঙ্গীত শিখেছেন, কিন্তু কোথাও নিজের শেকড় ছাড়েননি। তাঁর গায়কীতে খেয়ালের তান আছে, কিন্তু টপ্পার লয়, পুরাতনীর লিরিক- সব মিলিয়ে একটি মিশ্র বাঙালি পরিচয়।